সীসাকে আমরা সাধারণত আধুনিক যুগের একটি বিষাক্ত পদার্থ বলে মনে করি। কিন্তু নতুন একটি গবেষণা বলছে, এই পদার্থটি প্রায় ২০ লক্ষ বছর ধরে আমাদের এবং আমাদের পূর্বপুরুষদের পিছু ছাড়েনি। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সীসার সংস্পর্শে আসাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে কাছের প্রজাতি নিয়ান্ডারথালদের চেয়ে আধুনিক মানুষদের কিছুটা বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল।
একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল ১ লক্ষ থেকে ১৮ লক্ষ বছরের পুরোনো ৫১টি জীবাশ্ম দাঁত পরীক্ষা করেছে। এই দাঁতগুলো হোমো স্যাপিয়েন্স (আধুনিক মানুষ), নিয়ান্ডারথাল, এবং আরও কিছু প্রাচীন মানব প্রজাতি, যেমন অস্ট্রালোপিথেকাস, প্যারানথ্রোপাস এবং গিগান্টোপিথেকাসের ছিল।
গবেষকরা জানিয়েছেন, তারা প্রায় ৭৩ শতাংশ নমুনায় মাঝে মাঝে সীসার সংস্পর্শে আসার স্পষ্ট চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন।
সীসার সংস্পর্শে আসার বিপদগুলো আমাদের সবারই জানা। তবে গবেষকদের মতে, এই বিপদ নিয়ান্ডারথালদের জন্য আরও বেশি মারাত্মক ছিল। তারা গবেষণাগারে তৈরি করা কৃত্রিম ছোট মস্তিষ্ক বা “মিনি-ব্রেন” নিয়ে একটি পরীক্ষা চালান। এই মস্তিষ্কগুলোতে ‘NOVA1’ নামের একটি জিনের দুটি সংস্করণ ব্যবহার করা হয় – একটি সংস্করণ আধুনিক মানুষের, এবং অন্যটি নিয়ান্ডারথালদের।
দেখা যায়, যখন নিয়ান্ডারথালদের জিনযুক্ত মস্তিষ্কে সীসার প্রভাব ঘটানো হয়, তখন ‘FOXP2’ নামের আরেকটি জিনের কাজে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। এই ‘FOXP2’ জিনটি কথা বলা এবং ভাষা বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে, আধুনিক মানুষের জিনযুক্ত মস্তিষ্কে সীসার প্রভাব অনেক কম পড়েছিল।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যালিসন মুওত্রি বলেন, “এই ফলাফল থেকে বোঝা যায় যে আমাদের NOVA1 জিনটি হয়তো সীসার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে আমাদের মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দিয়েছিল।” তিনি আরও বলেন, “এটি একটি অসাধারণ উদাহরণ যে কীভাবে পরিবেশের চাপ (এখানে সীসার বিষাক্ততা) আমাদের জিনে এমন পরিবর্তন এনেছিল, যা আমাদের টিকে থাকতে এবং যোগাযোগের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করেছে।”
সাধারণত মনে করা হয়, খনি থেকে ধাতু উত্তোলন এবং শিল্প বিপ্লবের সময় থেকেই সীসার বিষাক্ততা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এরপর রঙ এবং জ্বালানিতে সীসা মেশানোর ফলে এটি আরও ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু প্রাচীন মানুষেরা সীসার সংস্পর্শে আসত প্রাকৃতিক উৎস থেকে, যেমন – আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, দাবানল এবং বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যার ফলে তাদের খাবার ও পানিতে সীসা মিশে যেত। বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে এর প্রভাব ভিন্ন ছিল। যেমন, এক প্রজাতির দাঁতে খুব কম সীসার চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা হয়তো হঠাৎ দাবানলের মতো কোনো ঘটনার কারণে ঘটেছিল। কিন্তু অন্য প্রজাতি, যারা বিভিন্ন ধরনের খাবার খেত, তাদের শরীরে খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে প্রায়শই বেশি পরিমাণে সীসা প্রবেশ করত।
যদিও এই গবেষণাটি চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে না যে সীসার কারণেই আমরা নিয়ান্ডারথালদের থেকে এগিয়ে গেছি, তবে এটি আমাদের বিবর্তনের ইতিহাসের একটি নতুন ও আকর্ষণীয় দিক তুলে ধরেছে।
