গবেষকরা মাম্বা সাপের বিষে এক ধরনের ‘দ্বিতীয় আঘাতের’ সন্ধান পেয়েছেন। এর ফলেই বোঝা যায়, কেন কিছু রোগী অ্যান্টিভেনম দেওয়ার পর সুস্থ হতে শুরু করেও হঠাৎ করে আবার যন্ত্রণাদায়ক খিঁচুনিতে ভুগতে শুরু করেন।
দেখা গেছে, বেশ কয়েক প্রজাতির মাম্বা সাপ প্রথমে শিকারের মাংসপেশী অবশ করে দেয়। এরপর যখন অ্যান্টিভেনম দিয়ে এই প্রভাবটি দূর করা হয়, তখন বিষটি স্নায়ুতন্ত্রের একটি ভিন্ন অংশে আঘাত করে, যার ফলে শরীরে অনিয়ন্ত্রিত খিঁচুনি শুরু হয়।
মাম্বার বিষের লুকানো বিপদ
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি যুগান্তকারী গবেষণায় বিশ্বের অন্যতম বিষাক্ত সাপ ব্ল্যাক মাম্বার বিষের একটি লুকানো বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য আবিষ্কৃত হয়েছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্রায়ান ফ্রাই জানান, গবেষণায় দেখা গেছে যে মাম্বার তিনটি প্রজাতির বিষ স্নায়ুতন্ত্রের উপর যতটা জটিল প্রভাব ফেলে, তা আগে ধারণা করা হতো না। একারণেই অ্যান্টিভেনম মাঝে মাঝে ঠিকমতো কাজ করতে পারে না।
স্নায়ুতন্ত্রে দ্বিমুখী আক্রমণ
অধ্যাপক ফ্রাই বলেন, “ব্ল্যাক মাম্বা, ওয়েস্টার্ন গ্রিন মাম্বা এবং জেমসন’স মাম্বা শুধু এক ধরনের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে না; তারা একসাথে স্নায়ুতন্ত্রের দুটি ভিন্ন জায়গায় আক্রমণ করে।”
“যদি আপনাকে এই তিন প্রজাতির কোনো একটি সাপ কামড়ায়, তবে প্রথমে আপনার শরীর নরম বা শিথিল হয়ে অবশ হয়ে যাবে।”
অ্যান্টিভেনম কেন মাঝে মাঝে ব্যর্থ হয়
“বর্তমান অ্যান্টিভেনমগুলো এই শরীর অবশ হয়ে যাওয়াকে ঠিক করতে পারে, কিন্তু এরপরই বিষের দ্বিতীয় প্রভাব শুরু হয়। তখন স্নায়ুতন্ত্রের অন্য একটি অংশ আক্রান্ত হয় এবং মারাত্মক খিঁচুনি শুরু হয়।”
“আগে আমরা ভাবতাম শুধু ইস্টার্ন গ্রিন মাম্বা নামের চতুর্থ প্রজাতির সাপেরই এই ধরনের খিঁচুনি সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে।”
“এই আবিষ্কারটি একটি পুরোনো রহস্যের সমাধান করেছে। আগে বোঝা যেত না কেন মাম্বার কামড়ের পর কিছু রোগী অ্যান্টিভেনম পেয়ে সুস্থ হতে শুরু করার পরেও হঠাৎ যন্ত্রণাদায়ক এবং অনিয়ন্ত্রিত খিঁচুনিতে ভুগতে শুরু করেন।”
ব্যাপারটা অনেকটা এরকম – বিষ প্রথমে স্নায়ু থেকে মাংসপেশীতে সংকেত পৌঁছানো বন্ধ করে দেয়। কিন্তু অ্যান্টিভেনম দেওয়ার পর, বিষের দ্বিতীয় অংশটি মাংসপেশীকে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে তোলে।
বিষয়টা যেন “একটি রোগের চিকিৎসা করার পর হঠাৎ করে আরেকটি রোগ প্রকাশ পাওয়ার মতো।”
সাব-সাহারান আফ্রিকায় এক মারাত্মক হুমকি
আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চলে মাম্বা (Dendroaspis প্রজাতির) সাপের কামড় একটি বড় ধরনের হুমকি, যেখানে প্রতি বছর প্রায় ৩০,০০০ মানুষ মারা যায়।
গবেষণার পরীক্ষামূলক কাজগুলো যিনি করেছেন, সেই পিএইচডি প্রার্থী লি জোনস বলেন, জীবন বাঁচানোর জন্য নতুন অ্যান্টিভেনম তৈরি করা কতটা জরুরি, এই গবেষণাটি তাই প্রমাণ করেছে।
গবেষণাগারের বিস্ময়কর ফলাফল
মি. জোনস বলেন, “আমরা বিভিন্ন প্রজাতির মাম্বার বিষের কার্যক্ষমতার পার্থক্য বোঝার জন্য কাজ শুরু করেছিলাম। আমরা আশা করেছিলাম যে বিষের প্রভাবে শরীর অবশ হয়ে যাবে এবং অ্যান্টিভেনম দিয়ে তা সহজেই ঠিক করা যাবে।”
“কিন্তু আমরা যা আশা করিনি তা হলো, অ্যান্টিভেনম দেওয়ার পর বিষের দ্বিতীয় বা লুকানো প্রভাবটি প্রকাশ পাবে, যা স্নায়ুতন্ত্রের অন্য অংশে খিঁচুনি সৃষ্টি করবে।”
“আমরা আরও দেখেছি যে, মাম্বার বিষের কার্যকারিতা তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের উপর নির্ভর করে, বিশেষ করে কেনিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ব্ল্যাক মাম্বার মধ্যে এই পার্থক্য দেখা যায়।”
“এর ফলে চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ বিভিন্ন অঞ্চলের বিষের এই ভিন্নতা মাথায় রেখে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা হয় না।”
উন্নত অ্যান্টিভেনম এবং চিকিৎসার দিকে এক ধাপ
অধ্যাপক ফ্রাই বলেছেন, এই গবেষণার পর আরও কার্যকর বিশেষ অ্যান্টিভেনম তৈরি করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, “এটি কেবল একটি একাডেমিক গবেষণা নয়, এটি চিকিৎসক এবং অ্যান্টিভেনম প্রস্তুতকারকদের জন্য একটি সরাসরি বার্তা।”
“বর্তমান অ্যান্টিভেনমের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে এবং বিষের সম্পূর্ণ কার্যকারিতা বোঝার মাধ্যমে আমরা সাপের কামড়ের চিকিৎসায় আরও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব।”
এই ধরনের গবেষণা ডাক্তারদের সঠিক সময়ে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে এবং শেষ পর্যন্ত অনেক জীবন বাঁচাবে।
