জলাভূমি, বন-জঙ্গল বা কবরস্থানে বাতাসে ভেসে বেড়ানো ভৌতিক আলোর কথা বহু শতাব্দী ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ বলে আসছে। সম্প্রতি একটি নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, এই ঘটনার পেছনে একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে, আর তা হলো এক ধরনের ‘ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ ঝলকানি’ বা ‘মাইক্রোলাইটেনিং’।
এই রহস্যময় ভাসমান আলোগুলোকে বাংলায় ‘আলেয়া’ বলা হয়। এগুলোকে নিয়ে নানা ধরনের মজার গল্প প্রচলিত আছে। কেউ মনে করে এগুলো মৃত ব্যক্তির আত্মা, আবার কেউ বলে এগুলো পথ হারানো আত্মার হাতের লণ্ঠন, যারা শয়তানকে ধোঁকা দিয়ে পৃথিবীতে চিরকাল ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হয়েছে।
কিন্তু এই লোককথার পেছনের বিজ্ঞানটা কী? এর আগের ব্যাখ্যাগুলোতে বলা হতো, জলাভূমির মিথেন গ্যাসে নিজে থেকেই আগুন জ্বলে গেলে এমন আলো তৈরি হয়। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়া কীভাবে আগুন জ্বলতে পারে, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছিল না।
এখন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদদের একটি গবেষণা বলছে, এর জন্য ‘মাইক্রোলাইটেনিং’ দায়ী হতে পারে। যেখানে গ্যাস এবং পানি একসাথে মেশে, সেখানে বিদ্যুতের এই ক্ষুদ্র ঝলকানি তৈরি হতে পারে। এরপর এটি বিভিন্ন চার্জযুক্ত বুদবুদের মধ্যে লাফিয়ে চলে এবং মিথেন গ্যাসে আগুন ধরিয়ে দেয়।
গবেষকরা ল্যাবে একটি পরীক্ষা করেন। তারা পানির মধ্যে বাতাস এবং মিথেন গ্যাস চালনা করে ছোট ছোট বুদবুদ তৈরি করেন এবং একটি উচ্চ-গতির ক্যামেরা দিয়ে তা পর্যবেক্ষণ করেন। তারা পরিষ্কারভাবে দেখতে পান যে, সেখানে এক মিলিসেকেন্ডেরও কম সময়ের জন্য বারবার বিদ্যুতের ঝলকানি তৈরি হচ্ছে।
যদিও শুধু বাতাসের বুদবুদ দিলেও এই আলোর ঝলকানি দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু যখন মিথেন গ্যাস দেওয়া হয়, তখন এর পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।
গবেষকরা তাদের গবেষণাপত্রে লিখেছেন, “মিথেন গ্যাসের ছোট ছোট বুদবুদের মধ্যে তৈরি হওয়া এই মাইক্রোলাইটেনিং সাধারণ অবস্থাতেই গ্যাসে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে।”
এই আবিষ্কারটি আলেয়ার মতো রহস্যময় আলোর ঘটনার একটি বাস্তবসম্মত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়।
শুধু তাই নয়, এই ঘটনাটি হয়তো আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই গবেষকদের মধ্যে কেউ কেউ আগে ধারণা দিয়েছিলেন যে, এই ধরনের ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ ঝলকানিই হয়তো সেই প্রথম স্ফুলিঙ্গ ছিল, যা জড় পদার্থ থেকে প্রাণের সঞ্চারকারী রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করেছিল।
গবেষণাটি PNAS নামের একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
