অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য বাংলাদেশের এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথভাবে তৈরি বিশেষ খাবার টাইম ম্যাগাজিনের সেরা আবিষ্কারের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা নতুন সব আবিষ্কার নিয়ে সম্মানজনক একটি তালিকা প্রকাশ করে বিখ্যাত ‘টাইম’ ম্যাগাজিন। বছরের সেরা আবিষ্কারের এই তালিকাটি তৈরি করা হয় অনেক যাচাই-বাছাই করে। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা টাইমের সম্পাদক ও সাংবাদিকরা সেরা আবিষ্কারগুলোর মনোনয়ন দেন, এমনকি অনলাইনের মাধ্যমেও আবেদন গ্রহণ করা হয়। এরপর প্রতিটি আবিষ্কারকে কয়েকটি দিক থেকে বিচার করা হয়, যেমন- এটি কতটা নতুন, কতটা কার্যকর, এর লক্ষ্য কতটা বড় এবং এটি মানুষের জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে। এই বছর তালিকাটি ছিল আগের চেয়েও বড়, যেখানে বিশ্বের সেরা ৩০০টি যুগান্তকারী আবিষ্কারকে স্থান দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের জন্য এআই ডিটেক্টর থেকে শুরু করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোলারকোস্টার এবং মানুষের মতো কাজ করতে পারা রোবটও ছিল এই তালিকায়।

এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় এবার জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের এক অসাধারণ অর্জন। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য বাংলাদেশের আইসিডিডিআর,বি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির যৌথভাবে তৈরি করা একটি বিশেষ খাবার এই তালিকায় স্থান পেয়েছে। ‘MDCF-2’ নামের এই খাবারটিকে সামাজিক প্রভাব ক্যাটাগরিতে অন্যতম সেরা আবিষ্কার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি বিষয়। এই খাবারটি শুধু শিশুদের ক্ষুধাই মেটায় না, বরং তাদের স্বাস্থ্যের গভীরে গিয়ে কাজ করে।

কী এই ‘এমডিসিএফ-২’ এবং এটি কীভাবে কাজ করে? এটি মূলত ছোলা, সয়াবিন ও চিনাবাদামের গুঁড়া এবং কাঁচকলা দিয়ে তৈরি একটি সাশ্রয়ী খাবার। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণার পর এই উপাদানগুলো বেছে নিয়েছেন, কারণ এগুলো শিশুদের পেটের ভেতরে থাকা উপকারী জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়াকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। এই উপকারী জীবাণুগুলোই শিশুদের শরীরকে সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা করে। অপুষ্টির কারণে শিশুদের পেটের ভেতরের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়, আর এই খাবারটি সেই পরিবেশকে সারিয়ে তুলে তাদের ভেতর থেকে সুস্থ করে তোলে।

এই অসাধারণ আবিষ্কারের পেছনের কারিগর হলেন আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমীদ আহমেদ এবং ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ড. জেফরি গর্ডন। ড. তাহমীদের দীর্ঘদিনের গবেষণা এবং ড. গর্ডনের অন্ত্রের জীবাণু নিয়ে যুগান্তকারী কাজের ফসল হলো এই খাবারটি। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে লাখ লাখ শিশু অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। ড. তাহমীদ বলেন, “এই স্বীকৃতি আমাদের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। এটি দেখায় যে বিজ্ঞান ও সহমর্মিতা মিলে মানুষের বড় বড় সমস্যার সমাধান করতে পারে।” তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অপুষ্টিতে ভোগা লাখ লাখ শিশুর কাছে এই জীবন রক্ষাকারী খাবারটি পৌঁছে দেওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *