গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুম ভালো না হলে আপনার মস্তিষ্ক দ্রুত বুড়িয়ে যায়

আমরা আমাদের জীবনের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ ঘুমিয়ে কাটাই। কিন্তু ঘুম কোনোভাবেই সময় নষ্ট করা নয়। এটি অলসভাবে কাটানো কোনো সময় নয়, বরং একটি অত্যন্ত জরুরি প্রক্রিয়া যা আমাদের শরীরকে সতেজ করে এবং মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দেয়।

যখন ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, তখন মস্তিষ্ক তার ফল ভোগ করে। কখনো কখনো এই প্রভাবগুলো খুব সামান্য হয়, যা বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকে।

নতুন একটি গবেষণায়, আমি এবং আমার সহকর্মীরা যুক্তরাজ্যের ৪০ থেকে ৭০ বছর বয়সী ২৭,০০০ এরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ঘুমের অভ্যাস এবং তাদের মস্তিষ্কের এমআরআই (MRI) স্ক্যানের তথ্য পরীক্ষা করেছি। আমরা দেখেছি, যাদের ঘুম ভালো হয় না, তাদের মস্তিষ্ক তাদের আসল বয়সের তুলনায় বেশ খানিকটা বয়স্ক দেখাচ্ছিল।

মস্তিষ্ক “বয়স্ক দেখায়”—এর মানে কী? আমাদের সবার বয়স একই গতিতে বাড়ে, কিন্তু কিছু মানুষের শরীরের ভেতরের বয়স বা “বায়োলজিক্যাল ক্লক” অন্যদের চেয়ে দ্রুত বা ধীরে চলে।

ব্রেইন ইমেজিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (artificial intelligence) নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে গবেষকরা এখন মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যানের বিভিন্ন বিষয়, যেমন—মস্তিষ্কের কোষ কমে যাওয়া, মস্তিষ্কের বাইরের স্তর (কর্টেক্স) পাতলা হয়ে যাওয়া, বা রক্তনালীর ক্ষতি ইত্যাদি দেখে একজনের “ব্রেইন এজ” বা মস্তিষ্কের বয়স অনুমান করতে পারেন।

আমাদের গবেষণায়, এমআরআই স্ক্যান থেকে পাওয়া ১,০০০ এরও বেশি বিষয় ব্যবহার করে মস্তিষ্কের বয়স অনুমান করা হয়েছে। প্রথমে আমরা সবচেয়ে সুস্থ অংশগ্রহণকারীদের (যাদের বড় কোনো রোগ নেই) স্ক্যান ব্যবহার করে একটি মেশিন লার্নিং মডেলকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। মডেলটি যখন “শিখে” গেছে যে স্বাভাবিকভাবে বয়স বাড়লে মস্তিষ্ক কেমন দেখতে হয়, তখন আমরা এটি গবেষণার বাকি সবার ওপর প্রয়োগ করেছি।

আপনার আসল বয়সের চেয়ে “ব্রেইন এজ” বেশি হওয়াটা স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের পথ থেকে সরে যাওয়ার একটি লক্ষণ হতে পারে। আগের গবেষণায় দেখা গেছে, এমন বয়স্ক মস্তিষ্কের সাথে দ্রুত স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, ডিমেনশিয়ার (স্মৃতিভ্রংশ রোগ) ঝুঁকি বাড়া, এমনকি অকালে মৃত্যুর ঝুঁকিও জড়িত।

ঘুম একটি জটিল বিষয়, এবং শুধু একটি বিষয় দিয়ে কারো ঘুমের মান বোঝা যায় না।

তাই আমাদের গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের কাছে থেকে পাওয়া পাঁচটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে: ১. আপনি “সকালের পাখি” না “রাতজাগা প্যাঁচা” (অর্থাৎ সকালে তাড়াতাড়ি ওঠেন না রাতে দেরিতে ঘুমান)। ২. আপনি সাধারণত কত ঘণ্টা ঘুমান (৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সবচেয়ে ভালো)। ৩. আপনার অনিদ্রা বা ইনসমনিয়া আছে কি না। ৪. আপনি নাক ডাকেন কি না। ৫. দিনের বেলায় আপনার অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব থাকে কি না।

এই পাঁচটি বৈশিষ্ট্যকে মিলিয়ে আমরা একটি “স্বাস্থ্যকর ঘুমের স্কোর” তৈরি করেছি, যা ঘুমের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে।

যাদের মধ্যে চার বা পাঁচটি ভালো অভ্যাস ছিল, তাদের ঘুমের প্রোফাইলকে “স্বাস্থ্যকর” বলা হয়েছে। যাদের দুই বা তিনটি ভালো অভ্যাস ছিল, তাদের প্রোফাইল “মাঝারি” এবং যাদের শূন্য বা একটি ভালো অভ্যাস ছিল, তাদের প্রোফাইল “খারাপ” বলে ধরা হয়েছে।

যখন আমরা বিভিন্ন ঘুমের প্রোফাইলের সাথে মস্তিষ্কের বয়সের তুলনা করেছি, তখন পার্থক্যটা ছিল স্পষ্ট। স্বাস্থ্যকর ঘুমের স্কোরে প্রতি এক পয়েন্ট কমার সাথে সাথে মস্তিষ্কের বয়স এবং আসল বয়সের মধ্যে পার্থক্য প্রায় ছয় মাস করে বেড়ে গেছে।

গড়ে, যাদের ঘুমের প্রোফাইল “খারাপ”, তাদের মস্তিষ্ক তাদের আসল বয়সের তুলনায় প্রায় এক বছর বেশি বয়স্ক দেখাচ্ছিল। অন্যদিকে, যাদের ঘুমের প্রোফাইল “স্বাস্থ্যকর”, তাদের ক্ষেত্রে এমন কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি।

আমরা পাঁচটি বিষয়কে আলাদাভাবেও দেখেছি। এর মধ্যে দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস এবং ঘুমের সময় অস্বাভাবিক হওয়া—এই দুটি বিষয় মস্তিষ্কের দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা গেছে।

এক বছর হয়তো খুব বেশি সময় মনে হচ্ছে না, কিন্তু মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার এই সামান্য গতিও সময়ের সাথে সাথে বাড়তে থাকে, যা ভবিষ্যতে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, ডিমেনশিয়া এবং অন্যান্য স্নায়ুবিক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ভালো খবর হলো, ঘুমের অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব। যদিও সব ঘুমের সমস্যা সহজে সমাধান করা যায় না, তবে কিছু সাধারণ কৌশল খুব কার্যকর। যেমন—প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও ওঠা, ঘুমানোর আগে ক্যাফেইন, অ্যালকোহল এবং স্ক্রিন (মোবাইল, টিভি) ব্যবহার কমানো, এবং শোবার ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখা। এই অভ্যাসগুলো ঘুমের মান উন্নত করতে এবং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারে।

কিন্তু ঘুমের মান কীভাবে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে?

এর একটি ব্যাখ্যা হতে পারে “প্রদাহ” বা ইনফ্ল্যামেশন (inflammation)। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, ঘুমের সমস্যা শরীরে প্রদাহের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই প্রদাহ বিভিন্নভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে: যেমন রক্তনালীর ক্ষতি করে, মস্তিষ্কে বিষাক্ত প্রোটিন জমতে সাহায্য করে এবং মস্তিষ্কের কোষের মৃত্যু ত্বরান্বিত করে।

অংশগ্রহণকারীদের থেকে সংগ্রহ করা রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে আমরা প্রদাহের ভূমিকা খতিয়ে দেখেছি। আমরা দেখেছি, ঘুম এবং মস্তিষ্কের বয়সের মধ্যে যে সম্পর্ক, তার প্রায় ১০% এর জন্য এই প্রদাহ দায়ী।

অন্যান্য কারণও থাকতে পারে

আরেকটি ব্যাখ্যা হলো “গ্লিম্ফেটিক সিস্টেম”—যা হলো মস্তিষ্কের নিজস্ব বর্জ্য পরিষ্কার করার একটি ব্যবস্থা। এটি মূলত ঘুমের সময়ই সক্রিয় থাকে। ঘুম ঠিকমতো না হলে এই ব্যবস্থাটি ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না, ফলে মস্তিষ্কে ক্ষতিকর পদার্থ জমতে শুরু করে।

আরেকটি কারণ হতে পারে যে, খারাপ ঘুম অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়ায় যা মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর। যেমন—টাইপ ২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা মোটা হয়ে যাওয়া এবং হৃদরোগ।

আমাদের গবেষণাটি এই ধরনের গবেষণার মধ্যে অন্যতম বৃহৎ এবং বিস্তারিত। আগের অনেক গবেষণায় খারাপ ঘুমের সাথে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং ডিমেনশিয়ার সম্পর্ক দেখানো হলেও, আমাদের গবেষণাটি প্রমাণ করেছে যে খারাপ ঘুম সরাসরি একটি পরিমাপযোগ্য বয়স্ক মস্তিষ্কের সাথে যুক্ত এবং এর পেছনে প্রদাহ একটি কারণ হতে পারে।

মস্তিষ্কের বয়স বাড়া ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু আমাদের আচরণ এবং জীবনযাত্রার মাধ্যমে আমরা এর গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারি। আমাদের গবেষণার বার্তাটি পরিষ্কার: মস্তিষ্ককে দীর্ঘকাল সুস্থ রাখতে চাইলে ঘুমকে অগ্রাধিকার দিতেই হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *