ওজন কমানোর নতুন কৌশল: শরীরকে এমন অনুভূতি দেওয়া যাবে যেন আপনি ব্যায়াম করেছেন

ব্যায়াম করলে যে শুধু ক্যালোরি পোড়ার কারণে ওজন কমে, তা কিন্তু নয়।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেলর কলেজ অফ মেডিসিনের গবেষকদের নেতৃত্বে ইঁদুরের উপর করা নতুন একটি গবেষণা দেখিয়েছে যে, কঠিন শারীরিক পরিশ্রম স্বাভাবিকভাবেই খিদে কমিয়ে দেয়।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, কঠিন ব্যায়াম করার পর ইঁদুরের রক্তে ল্যাক-ফে (Lac-Phe) নামের একটি উপাদান বেড়ে যায়। মনে করা হচ্ছে, ইঁদুরের মস্তিষ্কে এই ল্যাক-ফে এমন একটি অংশকে থামিয়ে দেয় যা খিদের উদ্রেক করে।

বেলরের গবেষক ইয়ং জু বলেছেন, এই আবিষ্কারটি একটি দারুণ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। হয়তো ভবিষ্যতে এমন নতুন ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হবে যা মানুষের ওজন কমানোর জন্য শরীরের এই প্রাকৃতিক পদ্ধতিকে কাজে লাগাবে।

যেমনটা ওজেম্পিক (Ozempic)-এর মতো জনপ্রিয় ওষুধের ক্ষেত্রেও হয়েছিল। এর মূল উপাদানটি এমন একটি প্রাকৃতিক হরমোনের অনুকরণে তৈরি করা হয়েছিল যা রক্তে শর্করার মাত্রা এবং মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণ করে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট জোনাথন লং বলেন, “এই আবিষ্কারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি ব্যাখ্যা করে যে, কীভাবে শরীরে স্বাভাবিকভাবে তৈরি হওয়া একটি অণু মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশকে প্রভাবিত করে খিদে এবং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”

যদিও ইঁদুরের উপর করা সব পরীক্ষা মানুষের ক্ষেত্রে সত্যি হয় না, কিন্তু ২০২২ সালে ইঁদুরের শরীরে ল্যাক-ফে আবিষ্কারের পর দেখা গেছে যে, ব্যায়াম করলে মানুষের শরীরেও এই উপাদানটি বেড়ে যায়।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ব্যায়ামের পর ল্যাক-ফে-এর মাত্রা বেশি ছিল, তাদের পেটের মেদও বেশি কমেছে।

এখন ইঁদুরের ওপর আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে, ল্যাক-ফে ঠিক কীভাবে কাজ করে।

আগের পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা যখন এমন ইঁদুর তৈরি করেন যারা ল্যাক-ফে তৈরি করতে পারে না, তখন দেখা যায় যে ব্যায়ামের পরেও তারা বেশি খাচ্ছে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত মোটা ইঁদুরকে যখন ইনজেকশনের মাধ্যমে ল্যাক-ফে দেওয়া হয়, তখন তাদের খাবার গ্রহণ কমে যায়, শরীরের ওজন ও চর্বি কমে আসে এবং রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণও ভালো হয়।

বেলরের স্নায়ুবিজ্ঞানী ইয়াং হি বলেন, “ল্যাক-ফে কীভাবে কাজ করে তা বোঝা খুব জরুরি। তাহলে এটিকে বা এর মতো অন্য কোনো উপাদানকে এমন ওষুধে পরিণত করা যাবে যা মানুষকে ওজন কমাতে সাহায্য করবে।”

“আমরা মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করেছি, কারণ মস্তিষ্কই আমাদের খিদে এবং খাওয়ার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।”

গবেষকরা ইঁদুরের মস্তিষ্কের দুই ধরনের কোষ নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। এক ধরনের কোষের নাম এজিআরপি (AgRP) নিউরন, যা খিদে বাড়ায়। এটি অন্য এক ধরনের কোষ, পিভিএইচ (PVH) নিউরনকে দমন করে কাজ করে, যা সাধারণত খিদে কমায়।

যখন এজিআরপি (খিদে বাড়ানোর) কোষের কাজ বন্ধ হয়ে যায়, তখন পিভিএইচ (খিদে কমানোর) কোষ সক্রিয় হয় এবং আমাদের খিদে কমে যায়। দেখা গেছে, ল্যাক-ফে এই খিদে বাড়ানোর কোষের কাজেই বাধা দেয়।

যদি মানুষের শরীরেও ল্যাক-ফে একইভাবে কাজ করে, তাহলে এমন ওষুধ তৈরি করা সম্ভব যা এই উপাদানটির অনুকরণে মস্তিষ্কের খিদে বাড়ানোর কোষকে দমন করবে এবং এর ফলে আমাদের খিদে কমে যাবে।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে এখনও অনেক কাজ বাকি। গবেষণাটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে একটি দারুণ সূচনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *