বিখ্যাত রাফায়েল মাস্টারপিসের মধ্যে লুকানো এক অস্বাভাবিক বিবরণ খুঁজে পেল এআই (AI)

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, যাতে এটি ছবির এমন সব খুঁটিনাটি বিষয় দেখতে পায় যা মানুষের চোখ এড়িয়ে যায়। ২০২৩ সালে, একটি এআই নিউরাল নেটওয়ার্ক বিখ্যাত শিল্পী রাফায়েলের আঁকা একটি ছবির একটি মুখের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু খুঁজে পায়: মুখটি আসলে রাফায়েলের আঁকা ছিল না।

এই মুখটি হলো সেন্ট জোসেফের, যা ‘ম্যাডোনা ডেলা রোজা’ (বা ‘গোলাপের ম্যাডোনা’) নামের বিখ্যাত ছবিটির উপরের বাম দিকে দেখা যায়।

শিল্প বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই এই ছবিটি সত্যি রাফায়েলের আঁকা কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করে আসছেন। যদিও একটি শিল্পকর্মের উৎস প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন প্রমাণের প্রয়োজন হয়, কিন্তু এআই অ্যালগরিদমের উপর ভিত্তি করে একটি নতুন বিশ্লেষণ পদ্ধতি সেইসব বিশেষজ্ঞদের পক্ষেই রায় দিয়েছে যারা মনে করেন যে, ছবিটির অন্তত কিছু অংশ অন্য কোনো শিল্পীর আঁকা।

যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা একটি বিশেষ বিশ্লেষণ অ্যালগরিদম তৈরি করেছেন। এই অ্যালগরিদমটি রাফায়েলের আঁকা আসল ছবিগুলোর উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ ও কম্পিউটার বিজ্ঞানী হাসান উগাইল ২০২৩ সালে বলেন, “আমরা কম্পিউটারে রাফায়েলের আসল ছবিগুলো দেখিয়ে তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, যাতে সে তাঁর আঁকার শৈলী খুব ভালোভাবে চিনতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে তুলির টান, রঙের ব্যবহার, এবং ছবির প্রতিটি অংশ।”

“কম্পিউটার মানুষের চোখের চেয়ে অনেক গভীরভাবে, এমনকি মাইক্রোস্কোপিক স্তরেও দেখতে পারে।”

মেশিন লার্নিংয়ের জন্য সাধারণত প্রচুর উদাহরণ দিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হয়, যা একজন শিল্পীর আঁকা সব ছবির ক্ষেত্রে সহজ নয়। এই ক্ষেত্রে, গবেষক দলটি মাইক্রোসফটের তৈরি ‘ResNet50’ নামের একটি মডেলকে নিজেদের মতো করে পরিবর্তন করেছে এবং এর সাথে ‘সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন’ নামের আরেকটি কৌশল ব্যবহার করেছে।

এই পদ্ধতিটি রাফায়েলের ছবি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে আগে ৯৮ শতাংশ নির্ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। সাধারণত, পুরো ছবি দিয়ে একে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, কিন্তু এবার গবেষকরা এটিকে ছবির ভেতরের আলাদা আলাদা মুখ পরীক্ষা করতে বলেন।

পরীক্ষায় দেখা যায়, ছবির ম্যাডোনা, শিশু এবং সেন্ট জনের মুখ রাফায়েলের হাতেই আঁকা। কিন্তু সেন্ট জোসেফের মুখের ক্ষেত্রে ফলাফল ভিন্ন ছিল। গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, ছবিটির সত্যতা নিয়ে আগের বিতর্কগুলোতেও সেন্ট জোসেফের মুখটি বাকিগুলোর তুলনায় দুর্বলভাবে আঁকা বলে মনে করা হতো।

উগাইল বলেন, “যখন আমরা পুরো ‘ডেলা রোজা’ ছবিটি পরীক্ষা করি, তখন ফলাফল নিশ্চিত ছিল না।”

“তাই আমরা ছবির প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে পরীক্ষা করি। তখন দেখা যায়, ছবির বাকি অংশ রাফায়েলের আঁকা বলে নিশ্চিত হওয়া গেলেও, জোসেফের মুখটি সম্ভবত রাফায়েলের আঁকা নয়।”

রাফায়েলের একজন ছাত্র, জুলিও রোমানো, হয়তো এই চতুর্থ মুখটি এঁকেছিলেন, তবে এটিও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। এটি ক্লাসিক্যাল ছবির গোপন রহস্য উন্মোচনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের আরও একটি উদাহরণ – আর এবার সেই প্রযুক্তি হলো এআই।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘ম্যাডোনা ডেলা রোজা’ ছবিটি ক্যানভাসের উপর ১৫১৮ থেকে ১৫২০ সালের মধ্যে আঁকা হয়েছিল। ১৮০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শিল্প সমালোচকরা সন্দেহ করতে শুরু করেন যে, রাফায়েল হয়তো পুরো ছবিটি আঁকেননি।

এখন সেই সন্দেহ প্রায় নিশ্চিতভাবে সত্যি প্রমাণিত হলো। তবে গবেষক দলটি জোর দিয়ে বলেছে যে, এই এআই ভবিষ্যতে শিল্প বিশেষজ্ঞদের সাহায্য করবে, তাদের জায়গা কেড়ে নেবে না।

উগাইল বলেন, “এটা এমন নয় যে এআই মানুষের চাকরি নিয়ে নিচ্ছে। একটি শিল্পকর্ম আসল কিনা তা যাচাই করার প্রক্রিয়ায় অনেক কিছু দেখতে হয়, যেমন – এর ইতিহাস, ব্যবহৃত রঙ, শিল্পকর্মটির বর্তমান অবস্থা ইত্যাদি।”

“তবে, এই ধরনের সফটওয়্যার সেই যাচাই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করার জন্য একটি হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *