বাংলাদেশের রাস্তায় এখন প্রতিটি মোড়েই চোখে পড়ে চার্জে চলা রঙিন রিকশা। মজার ব্যাপার হলো, মানুষ এগুলোকে আদর করে বলে “টেসলা”! এমনকি বিশ্বখ্যাত পত্রিকা The Economist সম্প্রতি এই ই-রিকশাগুলোকে নিয়ে লিখেছে, শিরোনাম দিয়েছে: “Bangla Teslas” give Musk a run for his money. যেখানে টেসলার দামী বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি নিয়ে দুশ্চিন্তা চলছে, সেখানে বাংলাদেশের শহরগুলোতে এই সাধারণ ব্যাটারিচালিত রিকশা দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনুমান করা হয়, দেশে এখন ৪০ লাখের বেশি ই-রিকশা চলছে, যা প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষকে বহন করছে। এক কথায় বলা যায়, এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অনানুষ্ঠানিক বৈদ্যুতিক যানবাহনের বহর।
আগে শহরের গলিপথে দেখা যেত প্যাডেল চালিত রিকশা, যেগুলো রঙিন ছবি আর নকশায় সাজানো থাকত। জাতিসংঘ পর্যন্ত এগুলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিশেষ অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে ২০০৭ সালের দিকে কিছু চালক চীনা মোটর আর লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি লাগিয়ে রিকশায় নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়া আনেন। এরপর থেকে ছোট ছোট কারখানায় এসব ই-রিকশা তৈরি হতে থাকে। চালকদের জন্য এটি আশীর্বাদের মতো, কারণ যেখানে একজন প্যাডেল চালক দিনে কষ্ট করে ২০০ টাকা রোজগার করেন, সেখানে ই-রিকশা চালিয়ে অনেকেই দিনে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
তবে সব সুখবরের সঙ্গে এসেছে কিছু বড় সমস্যা। অধিকাংশ ই-রিকশা যথেষ্ট মজবুত নয়, অথচ এগুলো ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে পারে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। একটি লোকাল সংস্থা এর হিসেবে দেখা যায় শুধু ২০২৪ সালেই প্রায় ৮৭০টি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় জড়িয়েছে ই-রিকশা, আর এ বছর এপ্রিলের মধ্যেই ৩৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আবার ব্যাটারির ঝামেলাও কম নয়। পুরোনো লেড-ব্যাটারি ফেলে দেওয়া হয় বা গলিয়ে পুনঃব্যবহার করা হয়, যার ফলে ক্ষতিকর ধোঁয়া ছড়িয়ে শিশুরা পর্যন্ত সিসা বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছে। ইউনিসেফের এক জরিপে জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৩.৫ কোটি শিশুর শরীরে বিপজ্জনক মাত্রায় সিসা রয়েছে।
সমাধানের পথও খোঁজা হচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিচ্ছেন লেড-ব্যাটারির বদলে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করতে। যদিও দাম বেশি, কিন্তু এগুলো অনেক নিরাপদ। এমনকি কিছু কোম্পানি ব্যাটারি বদলানোর ব্যবস্থা চালু করেছে – চালক চাইলে মুহূর্তে পুরোনো ব্যাটারি বদলে নতুন চার্জ করা ব্যাটারি নিতে পারেন। আর দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের কঠোর ভূমিকা জরুরি। আগেও ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে আইন আনা হলেও সঠিকভাবে কার্যকর হয়নি। এবার যদি গতি সীমা, রেজিস্ট্রেশন ও নিরাপত্তা নিয়মগুলো বাস্তবায়ন হয়, তবে হয়তো সত্যিকারের “বাংলা টেসলা” মানুষের যাতায়াতকে নিরাপদ করে তুলতে পারবে।
