কোটি কোটি বছর ধরে আমাদের পৃথিবীর মহাদেশগুলো বেশ স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। এই স্থিতিশীলতার কারণেই পাহাড়, নানা রকম পরিবেশ এবং মানুষের সভ্যতা গড়ে উঠেছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই ভাবছিলেন, মহাদেশগুলো কেন এত দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল রয়েছে। সম্প্রতি, পেন স্টেট এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এর একটি শক্ত প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন এবং তারা বলছেন, এর পেছনের মূল কারণ হলো প্রচণ্ড তাপ।
Nature Geoscience নামক একটি জার্নালে প্রকাশিত এই নতুন গবেষণা বলছে, দীর্ঘস্থায়ী মহাদেশীয় ভূত্বক (continental crust) তৈরির জন্য পৃথিবীর নিচের স্তরে ৯০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়েছিল। এই প্রচণ্ড তাপের কারণে ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের মতো তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো ওপরের দিকে উঠে আসে। এই পদার্থগুলো নিজেরা তাপ তৈরি করে, এবং নিচের স্তর থেকে ওপরে উঠে আসার সময় তারা সেই তাপও সাথে করে নিয়ে আসে। এর ফলে, পৃথিবীর ভূত্বকের নিচের অংশ ঠাণ্ডা ও শক্ত হয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত মহাদেশগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
গবেষকরা বলছেন, এই আবিষ্কার শুধু পৃথিবীর গঠন বোঝার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি আমাদের মূল্যবান খনিজ পদার্থ খুঁজে বের করতেও সাহায্য করতে পারে। স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য এই খনিজগুলো খুব জরুরি। এছাড়া, অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের বসবাসের যোগ্য পরিবেশ আছে কিনা, তা খুঁজে বের করতেও এই তথ্য বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে।
যে প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর ভূত্বক স্থিতিশীল হয়েছে, সেই একই প্রক্রিয়ায় লিথিয়াম, টিন এবং টাংস্টেনের মতো দুর্লভ খনিজগুলোও পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে, আজ আমরা কোথায় এই খনিজগুলো খুঁজে পেতে পারি, সে সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
গবেষণা দলের প্রধান অ্যান্ড্রু স্মাই বলেন, “বসবাসযোগ্য পরিবেশের জন্য স্থিতিশীল মহাদেশ থাকা আবশ্যক। কিন্তু স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য মহাদেশগুলোকে ঠাণ্ডা হতে হয়। আর ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম এবং পটাসিয়ামের মতো তাপ উৎপাদনকারী পদার্থগুলোকে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি চলে আসতে হয়। কারণ এই উপাদানগুলো যদি গভীরে থেকে যায়, তবে তারা তাপ তৈরি করে ভূত্বককে গলিয়ে ফেলবে।”
স্মাই আরও ব্যাখ্যা করেন যে, পৃথিবীর মহাদেশীয় ভূত্বক প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগে তৈরি হতে শুরু করেছিল। বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই ধারণা করতেন যে পুরনো ভূত্বক গলে গিয়েই নতুন স্থিতিশীল মহাদেশ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়ার জন্য আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়েছিল, যা প্রায় ২০০ ডিগ্রি বেশি।
তিনি এই প্রক্রিয়াটিকে স্টিল তৈরির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, “ধাতুকে প্রচণ্ড গরম করা হয় যতক্ষণ না এটি হাতুড়ির আঘাতে আকার দেওয়ার মতো নরম হয়। ঠিক একইভাবে, পর্বত তৈরির সময় টেকটোনিক শক্তি মহাদেশগুলোকে আরও মজবুত করে। আমরা দেখিয়েছি যে, ভূত্বককে এভাবে শক্তিশালী করার জন্য অতি উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন।”
এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য গবেষকরা ইউরোপের আল্পস এবং আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাথরের নমুনা বিশ্লেষণ করেছেন। তারা দেখতে পান যে, যে পাথরগুলো ৯০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় গলেছিল, সেগুলোতে তুলনামূলকভাবে কম তাপমাত্রায় তৈরি হওয়া পাথরের চেয়ে অনেক কম পরিমাণে ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়াম রয়েছে।
সাধারণত, ভূত্বকের গভীরে প্রতি কিলোমিটারে তাপমাত্রা প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়। বেশিরভাগ স্থিতিশীল মহাদেশের ভিত্তি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পুরু। তাই সেখানে ৯০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকাটা স্বাভাবিক নয়। স্মাই বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসের শুরুর দিকে, ভূত্বক গঠনকারী তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো থেকে আজকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ তাপ উৎপন্ন হতো। তখন প্রকৃতিতে অনেক বেশি তাপ ছিল, যা এই প্রক্রিয়াকে সম্ভব করেছিল।
এই গবেষণা মূল্যবান খনিজ খুঁজে বের করার জন্য নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা যদি সেই অতি-উচ্চ তাপমাত্রার বিক্রিয়াগুলো বুঝতে পারেন যা মূল্যবান উপাদানগুলোকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিয়েছিল, তাহলে তারা আজ সহজেই নতুন খনিজ ভান্ডার খুঁজে বের করতে পারবেন।
