অনেক ওষুধেরই কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ঝুঁকির তালিকা থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ঝুঁকিগুলো কতটা মারাত্মক এবং ওষুধের উপকারিতার তুলনায় সেগুলো কতটা গুরুতর?
নতুন একটি গবেষণা বলছে, ফিনাস্টেরাইড (finasteride) নামের একটি ওষুধের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকির বিষয়গুলো গত দুই দশক ধরে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। এই ওষুধটি ১৯৯০ সাল থেকে লক্ষ লক্ষ পুরুষ চুল পড়া রোধ করতে এবং প্রস্টেটের সমস্যা কমাতে ব্যবহার করে আসছে।
গবেষণার লেখক মায়ের ব্রেজিস (Mayer Brezis) বলেছেন, বহু বছর ধরেই এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে এই ওষুধটি মানুষের মেজাজের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। উদ্বেগ, হতাশা এবং আত্মহত্যার মতো গুরুতর মানসিক সমস্যার সাথে এই ওষুধের সম্পর্ক থাকার প্রমাণ বাড়লেও, ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এই বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে।
এই গবেষণাটি ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত আটটি ভিন্ন ভিন্ন গবেষণার তথ্য একত্রিত করে তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, যারা ফিনাস্টেরাইড গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে মানসিক অসুস্থতা এবং আত্মহত্যার চিন্তা অন্যদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) ২০১১ সালে ডিপ্রেশনকে এই ওষুধের একটি সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে তালিকাভুক্ত করে এবং ২০২২ সালে আত্মহত্যার ঝুঁকিও যোগ করে। কিন্তু গবেষণায় বলা হয়েছে, FDA-এর বিশেষজ্ঞরা ২০১০ সালেই “আত্মহত্যার চিন্তা এবং আচরণ” এর মতো বিষয়গুলো ওষুধের প্যাকেজের সতর্কবার্তায় যোগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা সংস্থাটি তখন গ্রহণ করেনি। ব্রেজিস এটিকে “ওষুধের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে একটি পদ্ধতিগত ব্যর্থতা” বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বিশ্বজুড়ে ওষুধের ব্যবহার বিবেচনা করলে আত্মহত্যার সংখ্যা হাজার হাজার হতে পারে, যা FDA-এর রেকর্ড করা মাত্র ১৮টি ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি।
ওষুধটির মূল প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘মার্ক’ (Merck) ২০২১ সালে বলেছিল যে তাদের ওষুধ প্রোপেশিয়া (Propecia – ফিনাস্টেরাইডের একটি ব্র্যান্ড নাম) এর সাথে আত্মহত্যার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ফিনাস্টেরাইড চুল পড়া রোধ করার জন্য টেস্টোস্টেরন হরমোনকে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন (DHT) নামক অন্য একটি হরমোনে রূপান্তরিত হতে বাধা দেয়। কিন্তু এটি মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক পদার্থ তৈরিতেও বাধা দেয়, যা আমাদের মেজাজ ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
এমনকি ওষুধ খাওয়া বন্ধ করার পরেও এর মানসিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মাস বা বছর ধরে চলতে পারে, যাকে “পোস্ট-ফিনাস্টেরাইড সিন্ড্রোম” বলা হয়।
গবেষকের সন্দেহ, আর্থিক লাভের কারণে ওষুধের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি শেষে বলেছেন, এই ধরনের ওষুধ বাজারে ছাড়ার আগে এর নিরাপত্তা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া উচিত। আর কোনো ওষুধ অনুমোদন পাওয়ার পরেও, তার নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমাগত গবেষণা করা আইনত বাধ্যতামূলক করা উচিত।
