ডলফিনরা কেন পথ হারিয়ে ফেলে এবং তীরে এসে আটকা পড়ে? তাদের মস্তিষ্কের কোনো সমস্যা, যেমন আলঝেইমারের মতো রোগ, কি এর জন্য দায়ী? সম্প্রতি একটি নতুন গবেষণায় এই বিষয়টিই খতিয়ে দেখা হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ফ্লোরিডার ইন্ডিয়ান রিভার লেগুন-এ তীরে আটকে পড়া ২০টি ডলফিনের ওপর এই গবেষণাটি করা হয়।
গবেষকরা ডলফিনের মস্তিষ্কের এই ক্ষতির সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি সংযোগ খুঁজে পেয়েছেন। তারা বলছেন, উষ্ণ পানির কারণে আজকাল পানিতে বিষাক্ত শ্যাওলা এবং ব্যাকটেরিয়া অনেক বেশি জন্মাচ্ছে, যা এই সমস্যার কারণ হতে পারে।
আটকে পড়া ডলফিনগুলোর মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা মানুষের আলঝেইমার রোগের সাথে সম্পর্কিত কিছু লক্ষণ খুঁজে পেয়েছেন। যেমন, তাদের মস্তিষ্কের জিনে কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে এবং প্রোটিন জমাট বেঁধে যাওয়ার মতো সমস্যাও লক্ষ্য করা গেছে, যা আলঝেইমার রোগের একটি প্রধান চিহ্ন।
তবে, যে ডলফিনগুলো বিষাক্ত শ্যাওলা জন্মানোর মৌসুমে আটকা পড়েছিল, তাদের মস্তিষ্কে একটি বড় পার্থক্য দেখা গেছে। তাদের মস্তিষ্কে ২,৪-ডাইঅ্যামিনোবিউটিরিক অ্যাসিড (2,4-DAB) নামের একটি বিষাক্ত পদার্থ পাওয়া গেছে, যার পরিমাণ অন্য সময়ে আটকে পড়া ডলফিনের চেয়ে ২,৯০০ গুণ বেশি!
এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, পানিতে জন্মানো এই বিষাক্ত শ্যাওলা ডলফিনদের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এর ফলেই হয়তো তারা দিক নির্ণয়ের ক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলে এবং তীরে এসে আটকা পড়ে।
মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ডেভিড ডেভিস বলেন, “ডলফিনরা যেহেতু সামুদ্রিক পরিবেশে বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতির সতর্ক সংকেত দেয়, তাই এই ঘটনাটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের কারণ।”
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে, ডলফিনদের বয়স বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই তাদের মস্তিষ্কে আলঝেইমারের মতো কিছু সমস্যা দেখা দেয়। আমরা এটাও জানি যে সায়ানোব্যাকটেরিয়া (এক ধরনের শ্যাওলা) থেকে নির্গত বিষ মানুষ ও প্রাণীর মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি করতে পারে। তবে মানুষের স্মৃতিভ্রংশ রোগের সাথে এর সরাসরি যোগসূত্র নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
গবেষকরা বলছেন, এই বিষাক্ত শ্যাওলাগুলো ডলফিনের মস্তিষ্কের সমস্যাকে আরও দ্রুত বাড়িয়ে তোলে এবং অবস্থাকে আরও খারাপ করে দেয়। এই গবেষণায় ক্ষতিকারক বিষ, মস্তিষ্কের ওপর তার প্রভাব এবং ঋতু পরিবর্তনের সাথে এর সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে।
গবেষকরা তাদের গবেষণা পত্রে লিখেছেন, “ডলফিনের মস্তিষ্কে আলঝেইমারের মতো পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক বিষাক্ত শ্যাওলার প্রভাব একসাথে দেখতে পাওয়া একটি বিরল সুযোগ, যা আমাদের মস্তিষ্কের ওপর এই দুটি জিনিসের সম্মিলিত প্রভাব বুঝতে সাহায্য করবে।”
এই ঝুঁকি শুধু ডলফিনের জন্য নয়। এই বিষাক্ত শ্যাওলা সমুদ্রের অন্যান্য অনেক প্রাণীকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর প্রভাব খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীর দেহে ছড়িয়ে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেও পৌঁছাতে পারে।
পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, এই শ্যাওলার বিষের সাথে স্মৃতিশক্তি হ্রাসের সম্পর্ক রয়েছে, যা আলঝেইমারের একটি প্রধান লক্ষণ। এই রাসায়নিক পদার্থগুলো যদি খাবারের মাধ্যমে বেশি পরিমাণে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে, তবে তা একটি গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
যদিও এই গবেষণাটি ডলফিনের ওপর করা হয়েছে, মানুষের ওপর নয়, কিন্তু গবেষকরা বলছেন মস্তিষ্কের ভেতরের কিছু মৌলিক পরিবর্তন উভয়ের ক্ষেত্রেই একই রকম। এখনও কোনো সরাসরি প্রমাণ পাওয়া না গেলেও, এই লক্ষণগুলো ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা এবং এ নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
এই গবেষকদের মধ্যে কয়েকজন এর আগেও সায়ানোব্যাকটেরিয়া এবং তার বিষ নিয়ে কাজ করেছেন। তারা দেখেছেন, এই বিষ পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে এবং খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে প্রাণীদের শরীরে জমা হতে পারে। এর ফলে মানুষের মধ্যেও বিভিন্ন ধরনের মস্তিষ্কের রোগ, এমনকি ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রংশ) হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
ডেভিস বলেন, “যদিও আলঝেইমার রোগের অনেক কারণ থাকতে পারে, তবে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসাটা দিন দিন একটি বড় ঝুঁকি বলে মনে হচ্ছে।”
গবেষণাটি ‘কমিউনিকেশন বায়োলজি’ নামক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
