একটি ক্ষুদ্র প্রাণী, যার শরীরের অঙ্গ নতুন করে গজানোর অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে, আমাদের শেখাতে পারে কীভাবে হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ পুনরুদ্ধার করা যায়।
মাথা কেটে ফেললে বেশিরভাগ প্রাণীই মারা যায়, কিন্তু চ্যাপ্টা কৃমির (flatworm) ক্ষেত্রে তা হয় না। এর মাথা কেটে ফেললে, এটি খুব সহজেই একটি নতুন মাথা গজাতে পারে। এমনকি, সেই কাটা মাথাটিও মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ নতুন শরীর তৈরি করে নিতে পারে। আসলে, এই কৃমির শরীরের প্রায় যেকোনো খণ্ডিত অংশ থেকেই একটি নতুন শরীর তৈরি হতে পারে।
এই অসাধারণ ক্ষমতার পেছনে রয়েছে স্টেম সেল (stem cell)। চ্যাপ্টা কৃমির ওপর নতুন একটি গবেষণা দেখিয়েছে যে, এই কোষগুলো কীভাবে শরীরের বিভিন্ন অংশ পুনর্গঠন করে, সে সম্পর্কে আমাদের এখনও অনেক কিছু জানার বাকি আছে।
‘শিমিডিয়া মেডিটারেনিয়া’ (Schmidtea mediterranea) নামের এই চ্যাপ্টা কৃমির চ্যাপ্টা শরীরে প্রচুর পরিমাণে প্রাপ্তবয়স্ক স্টেম সেল ছড়িয়ে থাকে। এই স্টেম সেলগুলো হলো এমন বিশেষ কোষ, যা শরীরের যেকোনো ধরনের কোষে পরিণত হতে পারে।
মানুষের শরীরে স্টেম সেলের পরিমাণ ১ শতাংশেরও কম, কিন্তু এই কৃমির শরীরের প্রায় ১৫ শতাংশই হলো স্টেম সেল। যখন এই কৃমি আঘাত পায়, তখন এর শরীরে থাকা স্টেম সেলগুলো দ্রুত নিজেদের সংখ্যা বাড়ায় এবং প্রয়োজনে শরীরের অন্য জায়গায় চলে যেতে পারে।
অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে, স্টেম সেলগুলো শরীরের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় (niche) জমা থাকে, যেখানে আশেপাশের কোষগুলোই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়। যেমন, মানুষের রক্ত তৈরির স্টেম সেলগুলো হাড়ের মজ্জার ভেতরে থাকে এবং সেখানেই তারা নতুন রক্তকণিকা তৈরি করে।
কিন্তু চ্যাপ্টা কৃমির স্টেম সেলগুলো তাদের আশেপাশের কোষের ওপর তেমন একটা নির্ভর করে না। গবেষকরা দেখেছেন, এই স্টেম সেলগুলো প্রায়শই অনেক ‘হাতওয়ালা’ এক ধরনের বড় কোষ দ্বারা বেষ্টিত থাকে। গবেষকরা এর নাম দিয়েছেন ‘হেকাটোনব্লাস্ট’।
কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এই ‘হেকাটোনব্লাস্ট’ কোষগুলো স্টেম সেলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখে না। বরং, স্টেম সেলের কাজ ও অবস্থান নিয়ন্ত্রণের জন্য এদের অন্ত্রের কোষগুলো (intestinal cells) বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যদিও সেই কোষগুলো স্টেম সেলের সরাসরি সংস্পর্শে থাকে না।
গবেষকরা বলছেন, “আমরা এখন বুঝতে পারছি যে স্টেম সেলের কাজ করার জন্য সবসময় একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ বা নিশের (niche) প্রয়োজন হয় না।” চ্যাপ্টা কৃমির মতো কিছু স্টেম সেল স্বাধীনভাবে কাজ করতে শিখেছে এবং তারা কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশের সাহায্য ছাড়াই যেকোনো কোষে পরিণত হতে পারে।
তবে আমাদের শরীরের স্টেম সেলগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি ভালো কারণ আছে। মানুষসহ অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রেই, অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে ওঠা কোষগুলো ক্যান্সারে পরিণত হয়।
গবেষকদের আশা, স্টেম সেলগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না গিয়ে নির্দিষ্ট অঙ্গে পরিণত হয়, সেই নিয়মগুলো তারা খুঁজে বের করতে পারবেন। কারণ মানুষের শরীরে টিউমার তখনই শুরু হয়, যখন স্টেম সেলগুলো এই নিয়মগুলো মানা বন্ধ করে দেয়।
এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে মানুষের জন্য নতুন চিকিৎসা এবং শরীরের অঙ্গ পুনর্গঠনের থেরাপি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
